দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইরানের অন্তত দুটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির কাছে ব্যাপক নির্মাণকাজ চলছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কয়েক মাসের বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক স্থাপনাগুলো মেরামত করছে দেশটি। নভেম্বরে ধারণ করা স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানী তেহরানের কাছে কারাজের গার্মদারেহ সামরিক ঘাঁটি এবং উত্তর ইরানের শাহরুদ ঘাঁটিতে মাটি খনন ও নতুন ভবন নির্মাণের চিত্র দেখা গেছে। ব্রিটিশ গোয়েন্দা বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান মাইয়ারের বিশ্লেষকেরা স্যাটেলাইট ছবিগুলো পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছেন।
এ ছাড়া ইরানের অন্তত ১২টি সামরিক স্থাপনায় মেরামতকাজের চিহ্ন দেখা গেছে। এসব স্থাপনার মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও বিমানঘাঁটিও রয়েছে।
ইরাক সীমান্তের কাছে পশ্চিম ইরানের কেরমানশাহ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে ধ্বংস হওয়া ভবনগুলোর ওপর নতুন ছাদ নির্মাণ করা হয়েছে। অন্যদিকে রাজধানীর পূর্বে পারচিন সামরিক স্থাপনায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ও ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ধারাবাহিক বিমান হামলার পরও স্থাপনাটি বারবার মেরামত করা হয়েছে।
সাবেক মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার বিশ্লেষক জিম ল্যামসন বলেন, শাহরুদ ঘাঁটির কাছে খননকাজ ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শাহরুদের কাছের বিমানঘাঁটিতে একাধিকবার হামলা হয়েছে। এ কারণে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী তাদের উৎপাদনকেন্দ্রগুলো ভূগর্ভে সরিয়ে নেওয়ার উপায় খুঁজছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মাইয়ারের এক বিশ্লেষক বলেন, ভবিষ্যতে আরও হামলা থেকে অবকাঠামো রক্ষায় ইরানের ভূগর্ভে স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার একটি ধারাবাহিক প্রবণতা রয়েছে।
আয়ারল্যান্ডের সামরিক বাহিনীর সাবেক প্রধান ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মার্ক মেলেট বলেন, ভূগর্ভস্থ স্থাপনা নির্মাণের আরেকটি সুবিধা হলো, এতে বাইরের পর্যবেক্ষকদের পক্ষে স্থাপনাগুলোর পরিসর ও কার্যক্রমের অবস্থা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
কারাজ ও শাহরুদে নতুন স্থাপনা নির্মাণ
ইরানের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিমান হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এসব স্থাপনায় এখন ছোট পরিসরে মেরামতকাজ চালাচ্ছে ইরানি বাহিনী।
বিশ্লেষকদের মতে, পারচিন সামরিক স্থাপনার তালেঘান ২ কেন্দ্রে উল্লেখযোগ্য নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে বলে স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ একটি বাংকারে হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত ও কংক্রিট দিয়ে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে।
কারাজ ও শাহরুদে ব্যাপক খননকাজের চিত্রও দেখা গেছে। কারাজের স্যাটেলাইট ছবিতে একাধিক যানবাহন দেখা গেছে। পাশাপাশি কাছের বিমানঘাঁটিতেও উন্নয়নকাজ হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিদেশনীতি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা বিশ্লেষক স্যাম লেয়ার বলেন, কারাজের ছবিতে ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় প্রবেশের জন্য নতুন একটি প্রবেশপথ দেখা যাচ্ছে।
জেনসের বিশ্লেষণেও কারাজে নতুন স্থাপনা নির্মাণের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সেখানে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ ও বিভিন্ন কাঠামো দেখা যাচ্ছে। এগুলো কাছের ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়া ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির সম্প্রসারণের অংশ হতে পারে। তবে এগুলো অস্ত্র সংরক্ষণ বা অন্য কোনো কাজেও ব্যবহৃত হতে পারে।
জেনসের বিশ্লেষক শন ও’কনর বলেন, বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে এসব নির্মাণকাজ করা হচ্ছে বলে মনে হয় না। এমন প্রকল্প ব্যয়বহুল হতে পারে, অথচ এর মাধ্যমে খুব বেশি সুফল নাও পাওয়া যেতে পারে।
নতুন হামলার আশঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে আবার হামলা চালানো হতে পারে বলে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে জল্পনা বেড়েছে।
তবে বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, ইরান যুদ্ধের প্রতি ভোটারদের অসন্তোষের কারণে এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের খারাপ ফল হয়েছে। তার মতে, এ যুদ্ধের কারণে আগামী ছয় বছরের জন্য সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে তার দল।
এদিকে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বারবার দাবি করেছে হোয়াইট হাউস। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সামরিক বাহিনীকে ‘সম্পূর্ণ ও চরম বিশৃঙ্খল’ বলে অভিহিত করেছেন।
এর আগে পেন্টাগনের এক মুখপাত্র বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ড্রোন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও নৌবাহিনীর সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন সক্ষমতার ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ধ্বংস করেছে। পাশাপাশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তবে ইরান দাবি করছে, তাদের কাছে এখনো বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রয়েছে।
চলতি সপ্তাহে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত একটি ভিডিওতে দক্ষিণ ইরানের একটি ভূগর্ভস্থ স্থাপনার প্রবেশপথে কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র দেখা গেছে বলে দাবি করা হয়।
এর আগে গত আগস্টে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত আরেকটি ভিডিওতে দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর আব্বাস শহরের কাছে একটি সুড়ঙ্গ থেকে খোরদাদ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র বেরিয়ে আসতে দেখা গেছে বলে দাবি করা হয়েছিল।
কুমের কাছেও নির্মাণকাজ
মাইয়ারের এক বিশ্লেষক কুম শহরের বাইরে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথের কাছে নতুন নির্মাণকাজ ও খননের চিত্র শনাক্ত করেছেন। এলাকাটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের একাধিকবার বোমা হামলার শিকার ফোরদো ভূগর্ভস্থ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রের কাছাকাছি।
যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ও আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্রের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সামরিক বিশ্লেষক মার্ক ক্যানসিয়ান বলেন, সামরিক স্থাপনাগুলোতে এ ধরনের তৎপরতা ইঙ্গিত দেয়, ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আরও হামলার আশঙ্কায় প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতের হামলা থেকে নিজেদের আরও ভালোভাবে রক্ষা করাই এর উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে এটি ইঙ্গিত দেয়, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পরিবর্তে সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে ইরান।’
/অ